রমাযান মাসের ফজিলত ও সুন্নাতসমুহ

হিজরী বর্ষপঞ্জির নবম মাসের নাম ‘রমাযান’। রমাযান শব্দের অর্থ জ্বালিয়ে দেয়া-পুড়িয়ে দেয়া। বিশিষ্ট অভিধানবিদ আল্লামা ফিরোযাবাদী এ মাসের নাম রমাযান হবার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। যেমন-(১)অত্যাধিক গরমের সময় এ মাস পড়েছিল বলে।(২)এ মাসে সিয়াম পালনকারীর পেটের জ্বালা বেশী হয় বলে।(৩)সিয়াম দ্বারা পাপসমূহ ভস্মীভূত হয় বলে।
রমাযান-মাসের-ফজিলত-ও-সুন্নাতসমুহ1

রমাযান মাস আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ নিয়ামত। সওয়াব অর্জন করার মাস। এ মাসেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। রহমত,বরকত ও নাজাতের মাস রমাযান মাস। রমাযানের রোযা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম। ঈমান ও নামায পরই রোযার স্থান। রোযার আরবি শব্দ সওম,যার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা।

রোযার অর্থ ও সংজ্ঞা

রোযার আরবি শব্দ সওম,যার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। পরিভাষায় সওম বলা হয়, প্রত্যেক সজ্ঞান, বালেগ, মুসলমান নর-নারীর সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে পানাহার, স্ত্রী সহবাস ও রোযাভঙ্গকারী সকল কাজ থেকে বিরত থাকা। সুতরাং রমাযান মাসের চাঁদ উদিত হলেই প্রত্যেক সুস্থ, মুকীম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং হায়েয-নেফাসমুক্ত প্রাপ্তবয়স্কা নারীর উপর পূর্ণ রমাযানের রোযা রাখা ফরয। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-'হে ঈমানদারগণ!তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (সূরা বাকারা -আয়াত/১৮৩)।

রমাযানের গুরুত্ব

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ-'রমাযান মাস,যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে,সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে। আর যে অসুস্থ হবে অথবা সফরে থাকবে তবে অন্যান্য দিবসে সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আল্লাহ তোমাদের সহজ চান এবং কঠিন চান না। আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন তার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা কর এবং যাতে তোমরা শোকর কর'।(সূরা বাকারাহ-আয়াত/১৮৫)।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ)বলেন,রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন-যখন তোমরা(রমাযানের)চাঁদ দেখবে, তখন থেকে রোযা রাখবে আর যখন(শাওয়ালের)চাঁদ দেখবে,তখন থেকে রোযা বন্ধ করবে। আকাশ যদি মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে ত্রিশ দিন রোযা রাখবে।(সহীহ বুখারী-হাদীস/১৯০৯),(সহীহ মুসলিম-হাদীস/১০৮০ (১৭-১৮)। কোরআন নাযিলের মাস-পবিত্র কুরআন নাযিল হওয়ার কারণে এ মাসে সিয়ামের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'রমাযান মাস,যাতে নাযিল করা হয়েছে আল-কোরআন। যা মানুষের হেদায়াত এবং সৎপথের সুস্পষ্ট নির্দেশ ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। সুতরাং যে ব্যক্তি রমাযান মাস পায় সে যেন সিয়াম পালন করে'।(সূরা বাক্বারাহ-আয়াত/১৮৫)।

রমাযান মাসের পূর্ব প্রস্তুতি

রমাযান মাসে আল্লাহর রহমত,ক্ষমা ও নাজাতের জন্য আমাদের উচিত এই মাসকে সামনে রেখে পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহন করা। যাতে আমরা কঠোর পরিশ্রম ও সাধনার এবং ইবাদতের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করতে পারি ইনশাআল্লাহ। রমাযান মাসের ফজিলত ও সুন্নাতসমুহ বলে শেষ করা যাবে না। নিম্নে তা সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো-

খালেস নিয়ত করা

খালেস নিয়তে ইবাদতের দৃঢ় সংকল্প করা। যেকোন কাজে সফলতার পূর্বশর্ত হলো সেই বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প করা। আর ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য খালেস নিয়তের বিকল্প নেই। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বলেন, ‘নিশ্চয়ই সকল কাজের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল’।(বুখারী-হাদীস/১)।

ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা

শাবান মাস থেকেই ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা। মহিমান্বিত রমাযান মাসে সফলতা লাভ করতে হলে শাবান মাস থেকেই নেক আমল শুরু করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) শাবান মাসে অধিক হারে সিয়াম পালন করতেন। আয়েশা (রাঃ)বলেন,‘আল্লাহর রাসূল (সাঃ)একাধারে এত অধিক সিয়াম পালন করতেন যে,আমরা বলাবলি করতাম তিনি আর সিয়াম পরিত্যাগ করবেন না। আবার কখনো এত বেশী সিয়াম পালন না করা অবস্থায় একাধারে কাটাতেন যে,আমরা বলাবলি করতাম তিনি আর(নফল)ছিয়াম পালন করবেন না। আমি রাসূল (সাঃ) কে রমাযান ব্যতীত পূর্ণ মাস ছিয়াম পালন করতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে কোন মাসে এতো অধিক (নফল)সিয়াম পালন করতে দেখিনি’।(বুখারী-হাদীস/১৯৬৯, ১৯৭০,৬৪৬৫-সিয়াম অধ্যায়, শাবানের সিয়াম-অনুচ্ছেদ,মুসলিম হাদীস/১১৫৬)।

তওবা করা

তওবা করে গুনাহ হতে সম্পূর্ণরূপে ফিরে আসা। বিভিন্ন পাপের দ্বারা মানুষ বড় গুনাহগার হয়ে যায়। রমাযান আসে সে পাপ মোচনের জন্য।অতএব পাপ হতে ফিরে এসে তওবার মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে ইবাদতে মনোযোগী হতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-'হে ঈমানদারগণ,তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর,খাঁটি তাওবা,আশা করা যায় তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত,নবী ও তার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে সেদিন আল্লাহ লাঞ্ছিত করবেন না। তাদের আলো তাদের সামনে ও ডানে ধাবিত হবে। তারা বলবে, 'হে আমাদের রব, আমাদের জন্য আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন,নিশ্চয় আপনি সর্ববিষয়ে সর্বক্ষমতাবান'।(সূরা তাহরীম-আয়াত/৮)। রাসূল (সাঃ) বলেন,'হে মানবজাতি,তোমরা আল্লাহর নিকটে তওবা কর কারণ,আমি তাঁর কাছে দিনে একশতবার তওবা করি’।(মুসলিম-হাদীস/২৭০২),(মিশকাত-হাদীস/২৩২৫)।

সিয়াম কাযা থাকলে

কাযা সিয়াম থাকলে তা আদায় করে নেওয়া। বিভিন্ন কারণে অনেকের সিয়াম কাযা হতে পারে। হয়ত নানা ব্যস্ততার কারণে যা আদায় করা হয়নি। রমাযানের পূর্বেই শাবান মাসের মধ্যেই তা আদায় করে নিতে হবে। আয়েশা(রাঃ)বলেন,‘আমার উপর রমাযানের যে কাযা হয়ে যেত তা পরবর্তী শাবান ব্যতীত আমি আদায় করতে পারতাম না’।(বুখারী-হাদীস/১৯৫০),(মুসলিম-হাদীস/১১৪৬)।

মাসআলা জেনে নেওয়া

রমাযান বিষয়ক মাসআলা জেনে নেওয়া। রমাযান সম্পর্কিত বিভিন্ন মাসআলা জেনে নেওয়া। যাতে রমাযানের সিয়াম ত্রুটিপূর্ণ হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। সেই সাথে অনেক বিষয়ে জ্ঞান না থাকার ফলে বিভিন্ন রকমের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন সফরকালে সিয়াম ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ,ভুল বশত খেলে সিয়াম ভঙ্গ না হওয়া,অতিরিক্ত ঘুমের কারণে সাহারী খেতে না পারলেও সিয়াম সিদ্ধ হওয়া এবং স্বপ্নদোষের কারণে সিয়াম ভঙ্গ না হওয়া ইত্যাদি মাসআলা জানা থাকলে তাৎক্ষণিক বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

নিয়ন্ত্রণ রাখা

নফস ও শয়তানের কুমন্ত্রণা হতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখা। মানুষের অন্তর মন্দপ্রবণ। শয়তান সর্বদা মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ব্যস্ত রয়েছে। আল্লাহ শয়তানের ভাষ্য উল্লেখ করে বলেন, 'আপনার ইজ্জতের কসম! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে বিপথগামী করব'। (সূরা সাদ-আয়াত/৮২)। সুতরাং ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্তরায় হলো মানুষের নফসে আম্মারা ও শয়তানের কুমন্ত্রণা। এই মাসে যদিও শয়তান শৃংখলিত থাকে তবুও রিপুর তাড়নায় মানুষ অন্যায় ও পাপ করে বসে। অনেক সময় নিজেকে ইবাদতে মসগুল রাখতে পারে না। তাই এই বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন হয়ে থাকতে হবে।

বিবাদ মিটিয়ে নেওয়া

পরস্পরের মধ্যে বিদ্যমান বিবাদ মিটিয়ে নেওয়া। রমাযানে মহান আল্লাহ অনেক মানুষকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু যাদের মাঝে বিবাদ বিদ্যমান আছে তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করেন না,যতক্ষণ না তারা তাদের মধ্যকার বিবাদ মিটিয়ে নেয়। রাসূল(সাঃ)বলেন,'সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজা খোলা হয় এবং প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করা হয় এ শর্তে যে,সে আল্লাহ তাআলার সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করবে না। আর সে ব্যক্তি এ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়,যে কোন মুসলিমের সাথে হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করে। ফেরেশতাদেরকে বলা হয় যে,এদের অবকাশ দাও,যেন তারা পরস্পর মীমাংসা করে নিতে পারে'।(মুসলিম হাদীস/২৫৬৫),(আবূদাঊদ-হাদীস/৪৬১৬),(তিরমিযী-হাদীস/২১০৯),(মিশকাত-হাদীস/৫০২৯)।

রমাযানের তাৎপর্য ও ফযিলত

রমাযান শব্দের শাব্দিক অর্থ দহন বা দগ্ধকরণ। রমাযান মাস মুসলমানদের মাঝে তাদের সমস্ত পাপ মোচন করার জন্য আসে। মানুষের জীবনের যেসব কুপ্রবৃত্তি,লোভ,মোহ,ক্রোধ রয়েছে যা মানুষকে ধ্বংস ও জ্ঞানশূন্য করে তোলে। এগুলো দহনের জন্যই এ দুনিয়ায় আল্লাহ তাআলা রমাযান মাস উপহার দিয়েছেন। যাতে এ দহনের ফলে মানুষ সঠিক পথে ফিরে আসতে পারে। রমাযান মাসের ফজিলত ও সুন্নাতসমুহ আমাদের পালন করতে হবে। কোরআনুল কারীমে ও সহীহ হাদীসে এজন্যই সিয়ামের এত মাহাত্ম্য ঘোষণা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ধনী ও গরিব এক সারিতে চলে আসে। সারা বৎসর যারা ধনীদের দ্বারে হাত পেতে কষ্টে দিন পার করেছে তারা যেমন সিয়াম পালন করে,তেমনি ধনীরাও সবকিছু থাকা সত্ত্বেও সিয়াম পালন করে।

এ মাসে অন্যায়,পাপকাজ ও সকল প্রকার খারাপ কাজ থেকে পবিত্রাণের মাধ্যম হচ্ছে এই সিয়াম। সিয়ামের অর্থ কেবল উপবাস থাকা নয় বরং সকল প্রকার কামনা-বসনা,সুখ-সম্ভোগ ও পাপাচার থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম। আল্লাহ প্রদত্ত অফুরন্ত কল্যাণ লাভের ক্ষেত্রেও রমাযানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। এজন্য রাসূলুল্লাহ(সাঃ)বলেন, 'সেই ব্যক্তির নাক মাটিতে মিশে যাক যে রমাযান পেল অথচ নিজেকে ক্ষমা করে নিতে পারল না'।(তিরমিযী,মিশকাত-হাদীস/৯২৭-সালাত অধ্যায়)।

রমাযান মাসের ফযিলাত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,'রমাযান বরকতময় মাস তোমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়েছে। পুরো মাস রোযা পালন আল্লাহ তোমাদের জন্য ফরয করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়,বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। দুষ্ট শয়তানদের এ মাসে শৃংখলাবদ্ধ করে দেয়া হয়। এ মাসে আল্লাহ কর্তৃক একটি রাত প্রদত্ত হয়েছে,যা হাজার মাস থেকে উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল,সে বঞ্চিত হল মহা কল্যাণ হতে'।(তিরমিযি-হাদিস/৬৮৩)।

রমাযানের শিক্ষা

রমাযান মাসে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। আমাদের তা অর্জন করতে হবে। নিম্নে আলোচনা করা হলো-

ভ্রাতৃত্ব

রমাযান আগমন করে আমাদের জীবনের পরিশুদ্ধির জন্য। এ মাস আমাদেরকে ধনী ও গরীবের মাঝে সমতা ও ভ্রাতৃত্ব শিক্ষা দেয়। আমরা সকলে যে একই আদমের সন্তান তা এ মাসে আমরা উপলদ্ধি করতে পারি। এ মাসে আমরা সকলে একই বিধান পালন করি এবং একে অপরের মধ্যেকার ভেদাভেদ ভুলে ভাই ভাই হয়ে যাই। সাম্য,ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ইসলামের সিয়ামে রয়েছে এক অভাবনীয় শিক্ষা। রয়েছে উত্তম নৈতিক চরিত্র গঠনের এক চমৎকার শিক্ষা। মহান আল্লাহ বলেন,'হে মানবমন্ডলী! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর,যিনি তোমাদেরকে একই নফ্‌স হতে সৃষ্টি করেছেন ও তা হতে তার সহধর্মিণী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের উভয় হতে বহু নর ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর সেই আল্লাহকে ভয় কর,যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাক এবং রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়র ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয়ই আল্লাহই তোমাদের তত্ত্বাবধানকারী'।(সূরা নিসা-আয়াত/১)। সকল মানুষ এক আত্মা থেকে জন্ম নিয়েছে ফলে তারা একে অপরের ভাই ভাই এবং এই ভ্রাতৃত্বের বহিঃপ্রকাশের জন্য দীর্ঘ এক বছর পর আমাদের সামনে আগমন করে রমাযান মাস। এই মাসে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সবাই ভ্রাতৃত্ব বজায় রেখে চলে এবং এক মনে ইবাদতে সময় ব্যয় করে।

আত্মসংযম

মানুষের মধ্যে পাপ প্রবণতা বা নিষিদ্ধ কাজের প্রতি বেশী আগ্রহী হয়। আল্লাহকে ভয় করার মাধ্যমে সিয়াম মানুষকে সম্পূর্ণরূপে পাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে প্রশিক্ষণ দেয়। কেননা রোজাদার সিয়ামরত অবস্থায় কোন পাপ কাজে লিপ্ত হলে তার সিয়ামের কোন মূল্য নেই। রাসূলুল্লাহ(সাঃ)বলেন, 'যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও পাপাচার পরিহার করল না,তার পানাহার পরিহার করায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই'।(বুখারী,মিশকাত-হাদীস/১৯৯৯)। আলী(রাঃ)বলেন,'খাদ্য-পানীয় থেকে বিরত থাকার নামই সিয়াম নয় বরং মিথ্যা,বাজে কাজ ও কথা থেকে বিরত থাকার নামই প্রকৃত সিয়াম'।(শু‘আবুল ঈমান ৩/৩১৭,হাদীস/৩৬৪৮)।

তাকওয়ার অনুশীলন

তাকওয়া লাভের জন্য সিয়ামের কোন বিকল্প নেই। পাপাচার ও ভীতিপ্রদ বিষয় থেকে আত্মরক্ষা করার নাম তাকওয়া। রমাযান মাসে এই সকল পাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা সকল রোজাদার করে থাকে। ফলে এই মাসে সিয়ামের মাধ্যমে তাকওয়ার অনুশীলন বেশী হয়।

প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ

মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তাকওয়াহীনতা ও গর্হিত কর্মে জড়িয়ে পড়ে। আর রমাযান এই সমস্ত প্রবৃত্তিমূলক কাজ-কর্ম থেকে রোজাদারকে মুক্ত রাখে। আব্দুল্লাহ বিন আমর(রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ(সাঃ) বলেছেন,  'কিয়ামতের দিন সিয়াম ও কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সিয়াম বলবে,হে প্রভু!আমি তাকে দিনে খাদ্য গ্রহণ ও সহবাস থেকে বিরত রেখেছি। কাজেই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন! কোরআন বলবে,আমি তাকে রাত্রিতে ঘুমানো থেকে নিবৃত্ত করেছি। অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। তখন তাদের দুজনেরই সুপারিশ গ্রহণ করা হবে'।(বায়হাক্বী, মিশকাত-হাদীস/১৯৬৩)।

আমল করার জন্য কিছু শর্ত

এ মাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে,যেগুলো পালন করার মাধ্যমে আমরা জান্নাতে যেতে পারি, জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে পারি। নিম্নে রমাযান মাসের আমল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। তবে এ আমলগুলো করার জন্য শর্ত হলো:

ইখলাস

ইখলাস অর্থাৎ একনিষ্ঠতার সাথে একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যে আমল করা। সুতরাং যে আমল হবে টাকা উপার্জনের জন্য,নেতৃত্ব অর্জনের জন্য ও সুনাম-খ্যাতি অর্জনের জন্যে সে আমলে ইখলাস থাকবে না অর্থাৎ এসব ইবাদাত বা নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হবে না বরং তা ছোট শির্কে রূপান্তরিত হতে পারে। আল-কুরআনে এসেছে,'আর তাদেরকে কেবল এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে,তারা যেন আল্লাহর ইবাদাত করে তাঁরই জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে'।(সূরা আল বাইয়্যেনাহ-আয়াত/৫)।

অনুসরণ ও অনুকরন

ইবাদাতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ। সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যে সকল ইবাদাতের কথা উল্লেখ আছে সেগুলো পরিপূর্ণ অনুসরণ করতে হবে। রমাযান মাসের ফজিলত ও সুন্নাতসমুহ এর মধ্যে অন্যতম সুন্নাত। এ ক্ষেত্রে কোনো বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ নেই। কারণ,ইবাদাত হচ্ছে তাই যা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) শিখিয়ে দিয়েছেন। কোরআনে এসেছে এবং রাসূল তোমাদের জন্য যা নিয়ে এসেছেন তা তোমরা গ্রহণ কর,আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও’।(সূরা হাশর-আয়াত/৭)। এ বিষয়ে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, 'যে এমন ইবাদত করল যাতে আমাদের কোন নির্দেশনা নেই তা পরিত্যাজ্য হিসাবে গণ্য হবে'। (সহীহ মুসলিম :হাদিস/৪৫৯০)।

রমাযান মাসের গুরুত্বপূর্ন আমলসমূহ

রমাযান মাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে। যা নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-

সিয়াম পালন করা

ইসলামের পাঁচটি রুকনের একটি রুকন হল সিয়াম।আর রমাযান মাসে সিয়াম পালন করা ফরজ। সেজন্য রমাযান মাসের প্রধান আমল হলো সুন্নাহ মোতাবেক সিয়াম পালন করা। মহান আল্লাহ বলেন, সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে,সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে'। (সূরা আল-বাকারাহ-আয়াত/১৮৫)। সিয়াম পালনের ফযিলাত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ইখলাস নিয়ে অর্থাৎ একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে সন্তুষ্টি করার জন্য রমাযানে সিয়াম পালন করবে,তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে'।(সহীহ বুখারী-হাদিস/২০১৪)।আরও বলেন, 'যে কেউ আল্লাহর রাস্তায়(অর্থাৎ শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশী করার জন্য) একদিন সিয়াম পালন করবে, তাদ্বারা আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে সত্তর বছরের রাস্তা পরিমাণ দূরবর্তীস্থানে রাখবেন'।(সহীহ মুসলিম-হাদিস/২৭৬৭)।

সময় মত নামাজ আদায় করা

সিয়াম পালনের সাথে সাথে সময় মত নামাজ আদায় করার মাধ্যমে জান্নাতে যাওয়ার পথ সুগম হয়। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে,'নিশ্চয় সালাত মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরয'।(সূরা নিসা-আয়াত/১০৩)। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে,আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাঃ)বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী!কোন আমল জান্নাতের অতি নিকটবর্তী? তিনি বললেন,সময় মত নামায আদায় করা'।(সহীহ মুসলিম-হাদিস/২৬৩)।

সহীহভাবে কোরআন শেখা

রমাযান মাসে কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। এ মাসের অন্যতম আমল হলো সহীহভাবে কোরআন শেখা। আর কুরআন শিক্ষা করা ফরয করা হয়েছে। কেননা কোরআনে বলা হয়েছে,'পড় তোমার রবের নামে,যিনি সৃষ্টি করেছেন'।(সূরা আলাক-আয়াত/১)। রাসূলুল্লাহ(সাঃ)কোরআন শেখার নির্দেশ দিয়ে বলেন,'তোমরা কোরআন শিক্ষা কর এবং তিলাওয়াত কর'।
(মুসনাদ আলজামি -৯৮৯০)।

অপরকে কোরআন পড়া শেখানো

রমাযান মাস অপরকে কোরআন শেখানোর উত্তম সময়। এ মাসে রাসূলুল্লাহ(সাঃ)নিজে সাহাবীদেরকে কোরআন শিক্ষা দিতেন। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই,যে নিজে কোরআন শিক্ষা করে ও অপরকে শিক্ষা দেয়,।(বুখারী-হাদিস/৫০২৭)। 'যে আল্লাহর কিতাব থেকে একটি আয়াত শিক্ষা দিবে,যত তিলাওয়াত হবে তার সাওয়াব সে পাবে'। (সহীহ কুনুযুস সুন্নাহ আন-নবুবিয়্যাহ :০৭)

সাহরী খাওয়া

সাহরী খাওয়ার মধ্যে বরকত রয়েছে এবং সিয়াম পালনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হাদীসে এসেছে, 'সাহরী হল বরকতময় খাবার। তাই কখনো সাহরী খাওয়া বাদ দিয়ো না। এক ঢোক পানি পান করে হলেও সাহরী খেয়ে নাও। কেননা সাহরীর খাবার গ্রহণকারীকে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর ফেরেশতারা স্মরণ করে থাকেন,।(মুসনাদে আহমাদ :১১১০১,সহীহ)।

সালাতুত তারাবীহ পড়া

সালাতুত তারাবীহ পড়া এ মাসের অন্যতম আমল। তারাবীহ পড়ার সময় তার হক আদায় করতে হবে। হাদীসে এসেছে,'যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব হাসিলের আশায় রমাযান কিয়ামু রমাযান(সালাতুত তারাবীহ)আদায় করবে,তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে'। (বুখারী-হাদিস/২০০৯)। তারাবীহ এর সালাত তার হক আদায় করে অর্থাৎ ধীরস্থীরভাবে আদায় করতে হবে। তারাবীহ জামায়াতের সাথে আদায় করা সুন্নাহ এবং রমাযান মাসের ফজিলত ও সুন্নাতসমুহ এর অন্তর্ভুক্ত। হাদীসে আছে,'যে ব্যক্তি ইমামের সাথে প্রস্থান করা অবধি সালাত আদায় করবে (সালাতুত তারাবীহ) তাকে পুরো রাত কিয়ামুল লাইলের সাওয়াব দান করা হবে'। (আবূ দাউদ-হাদিস/১৩৭৭)।

বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করা

এই মাস কোরআন নাযিলের মাস। তাই এ মাসে অন্যতম কাজ হলো বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করা। হাদীসে এসেছে,রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,'যে ব্যক্তি কোরআনের একটি হরফ পাঠ করে,তাকে একটি নেকি প্রদান করা হয়। প্রতিটি নেকি দশটি নেকির সমান। আমি বলি না যে,আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ। বরং আলিফ একটি হরফ,লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ'।(আত তিরমিযী-হাদিস/২৯১০)। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)রমাযান ব্যতীত কোন মাসে এত বেশি তিলাওয়াত করতেন না। আয়েশা(রাঃ) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন,'রমাযান ব্যতীত অন্য কোনো রাত্রিতে আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)কে পূর্ণ কোরআন তিলাওয়াত করতে,কিংবা ভোর অবধি সালাতে কাটিয়ে দিতে অথবা পূর্ণ মাস রোযা পালন করে কাটিয়ে দিতে দেখিনি,।(মুসলিম-হাদিস/১৭৭৩)।

শুকরিয়া আদায় করা

রমাযান মাস পাওয়া এক বিরাট সৌভাগ্যের বিষয়। সেজন্য আল্লাহ তাআলার বেশি বেশি শুকরিয়া আদায় করা এবং আগামী রমাযান পাওয়ার জন্য তাওফীক কামনা করা।রমাযান সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে,'আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন,তার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা কর এবং যাতে তোমরা শোকর কর'।(বাকারাহ-আয়াত/১৮৫) আরও বলেন, 'আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও,নিশ্চয় আমার আজাব বড় কঠিন'।(সূরা ইবরাহীম-আয়াত/৭)। আয়েশা(রাঃ)বলেন,নবী করীম(সাঃ)নিয়ামাতের শুকরিয়া আদায় করে বলতেন অর্থাৎ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য'।(আত তিরমিযী-হাদিস/২৭৩৮)।

কল্যাণকর কাজ বেশি বেশি করা

এ মাসটিতে একটি ভাল কাজ অন্য মাসের চেয়ে অনেক বেশি উত্তম। সেজন্য যথাসম্ভব বেশি বেশি ভাল কাজ করতে হবে। আবু হুরায়রা(রাঃ)থেকে বর্ণিত,'নবী করিম (সাঃ) বলেছেন, 'এ মাসের প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে আহবান করতে থাকে যে,হে কল্যাণের অনুসন্ধানকারী তুমি আরো অগ্রসর হও!হে অসৎ কাজের পথিক,তোমরা অন্যায় পথে চলা বন্ধ কর। তুমি কি জান? এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তায়ালা কত লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন'।(তিরমিযী-হাদিস/৬৮৪)।

সালাতুত তাহাজ্জুদ পড়া

রমাযান মাস ছাড়াও সালাতুত তাহাজ্জুদ পড়ার মধ্যে বিরাট সাওয়াব এবং মর্যাদা রয়েছে। রমাযানের কারণে আরো বেশি ফজিলত রয়েছে। যেহেতু সাহরী খাওয়ার জন্য উঠতে হয় সেজন্য রমাদান মাসে সালাতুত তাহাজ্জুদ আদায় করার বিশেষ সুযোগও রয়েছে। আবূ হুরায়রা(রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে নবী করীম(সাঃ)বলেছেন,'ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হল রাতের সালাত অর্থাৎ তাহাজ্জুদের সালাত'।(মুসলিম-হাদিস/২৮১২)।

বেশি বেশি দান সদকাহ করা

এ মাসে বেশি বেশি দান সদকাহ করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। ইয়াতীম, বিধবা ও গরীব মিসকীনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া ও বেশি বেশি দান খয়রাত করা। হিসাব করে এ মাসে যাকাত দেয়া উত্তম। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এ মাসে বেশি বেশি দান খয়রাত করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ)থেকে বর্ণিত,'রাসূলুল্লাহ (সাঃ)ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল আর রমাযানে তাঁর এ দানশীলতা আরো বেড়ে যেত'।(বুখারী-হাদিস/১৯০২)।

উত্তম চরিত্র গঠনের অনুশীলন করা

রমাযান মাস নিজকে গঠনের মাস। এ মাসে এমন প্রশিক্ষণ নিতে হবে যার মাধ্যমে বাকি মাসগুলো এভাবেই পরিচালিত হয়। কাজেই এ সময় আমাদেরকে সুন্দর চরিত্র গঠনের অনুশীলন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ(সাঃ)বলেছেন,'তোমাদের মধ্যে কেউ যদি রোযা রাখে,সে যেন তখন অশ্লীন কাজ ও শোরগোল থেকে বিরত থাকে। রোযা রাখা অবস্থায় কেউ যদি তার সাথে গালাগালি ও মারামারি করতে আসে সে যেন বলে,আমি রোযাদার'।(মুসলিম-হাদিস/১১৫১)।

ইতিকাফ করা

ইতিকাফ অর্থ অবস্থান করা। অর্থাৎ মানুষদের থেকে পৃথক হয়ে সালাত,সিয়াম,কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া,ইসতিগফার ও অন্যান্য ইবাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্যে একাকী কিছু সময় যাপন করা। এ ইবাদাতের এত মর্যাদা যে, প্রত্যেক রমাযানে রাসূলুল্লাহ(সাঃ) রমাযানের শেষ দশ দিন নিজে এবং তাঁর সাহাবীগণ ইতিকাফ করতেন। আবূ হুরায়রা(রাঃ)থেকে বর্ণিত,'প্রত্যেক রমযানেই তিনি শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু জীবনের শেষ রমাযানে তিনি ইতিকাফ করেছিলেন বিশ দিন'। দশ দিন ইতেকাফ করা সুন্নাত।(আল বুখারী-হাদিস/২০৪৪)।

দাওয়াতে দ্বীনের কাজ করা

রমাযান মাস হচ্ছে দ্বীনের দাওয়াতের সর্বোত্তম মাস।আর মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকাও উত্তম কাজ। এজন্য এ মাসে মানুষকে দ্বীনের পথে নিয়ে আসার জন্য আলোচনা করা, কোরআন ও হাদীসের শিক্ষা প্রদান,বই বিতরণ,কোরআন বিতরণ ইত্যাদি কাজ বেশি বেশি করা। আল কোরআনের ঘোষণা,'ঐ ব্যক্তির চাইতে উত্তম কথা আর কার হতে পারে যে আল্লাহর দিকে ডাকলো,নেক আমল করলো এবং ঘোষণা করলো,অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত '। (সূরা হা-মীম সাজদাহ-আয়াত /৩৩)। হাদীসে এসেছে, 'ভাল কাজের পথ প্রদর্শনকারী এ কাজ সম্পাদনকারী অনুরূপ সাওয়াব পাবে'।(তিরমীযি-হাদিস/২৬৭০)।

উমরা পালন করা

সামর্থ্য থাকলে উমরা পালন করা। এ মাসে একটি উমরা করলে একটি হজ্জ আদায়ের সমান সাওয়াব হয়। আবদুল্লাহ ইবনে আববাস(রাঃ)থেকে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,'রমাযান মাসে উমরা করা আমার সাথে হজ্জ আদায় করার সমতুল্য'।(বুখারী-হাদিস/১৮৬৩)।
রমাযান-মাসের-ফজিলত-ও-সুন্নাতসমুহ2

লাইলাতুল কদর তালাশ করা

রমাযান মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল-কুরআনের ঘোষণা,'কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম'।(সূরা কদর-আয়াত/৪)। হাদীসে রাসূল (সাঃ)বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াব পাওয়ার আশায় ইবাদাত করবে তাকে পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হব'।(বুখারী-হাদিস/৩৫)। এ রাত পাওয়াটা বিরাট সৌভাগ্যের বিষয়। এক হাদীসে আয়েশা (রাঃ)বলেন,'রাসূল (সাঃ)অন্য সময়ের তুলনায় রমাযানের শেষ দশ দিনে অধিক হারে পরিশ্রম করতেন'।(মুসলিম-হাদিস/১১৭৫)। লাইলাতুল কদরের দোআ-আয়েশা(রাঃ)বললেন,হে আল্লাহর নবী!যদি আমি লাইলাতুল কদর পেয়ে যাই তবে কি বলব ? রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বললেন, 'বলবে-হে আল্লাহ আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে ভালবাসেন,তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন'।(তিরমিযী-হাদিস/৩৫১৩)।

ইফতার করা

সময় হওয়ার সাথে সাথে ইফতার করা বিরাট ফজিলতপূর্ণ আমল। কোন বিলম্ব না করা । কেননা হাদীসে এসেছে,'যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করবে,সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে,খেজুর না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করবে। কেননা পানি হলো অধিক পবিত্র'।(আবু দাউদ-হাদিস/২৩৫৭)। নবী (সাঃ)যখন ইফতার করতেন তখন বলতেন,'পিপাসা নিবারিত হল,শিরা উপশিরা সিক্ত হল এবং আল্লাহর ইচ্ছায় পুরস্কারও নির্ধারিত হল'।(আবূ দাউদ-হাদিস/২৩৫৯)।

ইফতার করানো

অপরকে ইফতার করানো রমাযান মাসের ফজিলত ও সুন্নাতসমুহ এর মধ্যে একটি বিরাট সওয়াবের কাজ। প্রতিদিন কমপক্ষে একজনকে ইফতার করানোর চেষ্টা করা দরকার। কেননা হাদীসে এসেছে,'যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে,সে তার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে,তাদের উভয়ের সওয়াব হতে বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না'।(ইবন মাজাহ-১৭৪৬)।

তাওবাহ ও ইস্তেগফার করা

তাওবাহ শব্দের আভিধানিক অর্থ ফিরে আসা,গুনাহের কাজ আর না করার সিদ্ধান্ত নেয়া। এ মাস তাওবাহ করার উত্তম সময়। আর তাওবাহ করলে আল্লাহ খুশী হন। আল-কোরআনে এসেছে, 'হে ঈমানদারগণ,তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর,খাটি তাওবা। আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত'।(সূরা আত তাহরীম-আয়াত/৮)। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বলেছেন,'হে মানবসকল!তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবাহ এবং ক্ষমা প্রার্থনা কর,আর আমি দিনে তাঁর নিকট একশত বারের বেশি তাওবাহ করে থাকি'।(মুসলিম-হাদিস/৭০৩৪)।

তবে তাওবাহ ও ইস্তেগফারের জন্য উত্তম হচ্ছে,মন থেকে সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার পড়া। আর তা হলো-হে আল্লাহ,তুমি আমার প্রতিপালক,তুমি ছাড়া প্রকৃত ইবাদতের যোগ্য কেউ নাই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ,আর আমি তোমার গোলাম আর আমি সাধ্যমত তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকারের উপর অবিচল রয়েছি। আমার কৃত-কর্মের অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমাকে যত নেয়ামত দিয়েছে সেগুলোর স্বীকৃতি প্রদান করছি। যত অপরাধ করেছি সেগুলোও স্বীকার করছি। অত:এব তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। কারণ তুমি ছাড়া ক্ষমা করার কেউ নেই'। ফযিলত,যে কেউ দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে দিনের বেলা এই দোয়াটি(সাইয়েদুল ইসতিগফার)পাঠ করবে ঐ দিন সন্ধ্যা হওয়ার আগে মৃত্যু বরণ করলে সে জান্নাতবাসী হবে এবং যে কেউ ইয়াকিনের সাথে রাত্রিতে পাঠ করবে ঐ রাত্রিতে মৃত্যুবরণ করলে সে জান্নাতবাসী হবে'।(বুখারী-হাদিস/৬৩০৬)।

তাকওয়া অর্জন করা

তাকওয়া এমন একটি গুণ যা বান্দাহকে আল্লাহর ভয়ে যাবতীয় পাপকাজ থেকে বিরত রাখে এবং তাঁর আদেশ মানতে বাধ্য করে। আর রমাযান মাস তাকওয়া নামক গুণটি অর্জন করার এক বিশেষ মৌসুম। কোরআনে এসেছে,'হে ঈমানদারগণ!তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর।যাতে করে তোমরা এর মাধ্যমে তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো'। (সূরা বাকারাহ-আয়াত/১৮৩)। আরও এসেছে,'যে আল্লাহকে ভয় করে,তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন'।(সূরা তালাক-আয়াত/০২)।

মসজিদে অবস্থান করা

ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করা। ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করা। এটি একটি বিরাট সওয়াবের কাজ। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বলেছেন,'যে ব্যক্তি ফজর জামায়াত আদায় করার পর সূর্য উদয় পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করবে,অতঃপর দুই রাকায়াত সালাত আদায় করবে,সে পরিপূর্ণ হজ্জ ও উমরাহ করার প্রতিদান পাবে'।(তিরমিযী-হাদিস/৫৮৬)।

ফিতরা দেয়া

এ মাসে ফিতরা আদায় করতে হবে। যা রমাযান মাসের ফজিলত ও সুন্নাতসমুহ এর অন্যতম একটি সুন্নাত। ইবনে উমর (রাঃ)বলেন,'রাসূলুল্লাহ(সাঃ)ঈদের সালাত আদায়ের পুর্বে ফিতরা আদায় করার আদেশ দিলেন'।(বুখারী-হাদিস/১৫০৩)।

অপরকে খাদ্য খাওয়ানো

রমাযান মাসে লোকদের খাওয়ানো,বিশেষ করে সিয়াম পালনকারী গরীব, অসহায়কে খাদ্য খাওয়ানো বিরাট সওয়াবের কাজ । কুরআনে এসেছে,'তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকীন,ইয়াতীম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে'।(সূরা আদ দাহর-আয়াত/৮)। এই বিষয়ে হাদীসে বলা হয়েছে, 'আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত,একজন লোক এসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন,ইসলামে উত্তম কাজ কোনটি? তিনি বললেন,অন্যদেরকে খাবার খাওয়ানো এবং পরিচিত ও অপরিচিত সকলকে সালাম দেয়া'।(বুখারী-হাদিস/১২)। অপর বর্ণনায় বর্ণিত আছে যে,'যে কোনো মুমিন কোনো ক্ষুধার্ত মুমিনকে খাওয়াবে,আল্লাহ তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন,।(বাইহাকী,শু‘আবুল ইমান -৩০৯৮,হাসান)।

রোযার উদ্দেশ্য,উপকারিতা ও যৌক্তিকতা

রোযা হল এক এমন ইবাদত যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্যলাভের জন্য সকল খারাপ কাজ বর্জন করে এবং সকল প্রকার পানাহার ও যৌনক্রিয়া থেকে বিরত থাকা। আর এর মাধ্যম নিজ প্রতিপালকের সন্তুষ্টি কামনা করা এবং পরকালের মুক্তি ও বেহেশতলাভ করা। রোযাদার যথানিয়মে রোযা পালন করলে রোযা তাকে মুত্তাকী ও পরহেযগার বানাতে সহায়ক হয়। এবং রমাযান মাসের ফজিলত ও সুন্নাতসমুহ    পালন করলে তার জীবন পথে তাকওয়া ও পরহেযগারীর আলো বিচ্ছুরিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন,'হে ঈমানদারগণ!তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হল,যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের উপর ফরয করা হয়েছিল। যাতে তোমরা পরহেযগার হতে পার'।(সূরা বাকারাহ-আয়াত/১৮৩)। রাসূল(সাঃ)বলেন,'যে ব্যক্তি রোযা রেখে মিথ্যা কথা ও তার উপর আমল ত্যাগ করতে পারল না,সে ব্যক্তির পানাহার ত্যাগ করার মাঝে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।(বুখারী-হাদিস/৬০৫৭),(ইবনে মাজাহ- ১৬৮৯)।

রোযা আত্মাকে প্রশান্তি দান করে,চরিত্রকে সভ্য ও আদর্শভিত্তিক করে গড়ে তোলে। যে ব্যক্তির আল্লাহর সাথে আন্তরিকতা থাকবে, সে ব্যক্তি কখনই মানুষকে ধোকা দেবে না, আমানতে খেয়ানত করবে না, অপরকে ঠকিয়ে খাবে না, চুরি করবে না,জুলুম করবে না অথবা অপরকে কষ্ট দেবে না।

রোযা রোযাদারকে কুঅভ্যাসের দাসত্ব থেকে মুক্তিদান করে। এমন অনেক মানুষ আছে,যারা এমন অনেক নোংরা অভ্যাসে অভ্যাসী হয়ে পড়ে এবং তার ফাঁদ থেকে বের হওয়ার কোন পথ খুঁজে পায় না। কিন্তু রোযা এলে তাদেরকে দেখা যায় যে,তারা তাদের সে সমস্ত কুঅভ্যাসকে পরিপূর্ণরূপে বর্জন করে ফেলেছে। এটাই তাদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ যার মাঝে তাদের সেই সকল মন্দ অভ্যাসের বাঁধন থেকে নিজেদেরকে সহজ উপায়ে স্বাধীন করে নিতে পারে,যে সকল অভ্যাস তাদের মানসিক দুশ্চিন্তা ও ব্যাধির একমাত্র কারণ। অতএব সেই সকল রোযাদারগণ যারা ধুমপানে অভ্যাসী যাদের অবৈধ বিড়ি-সিগারেট ছাড়া ৩০ মিনিটও অতিবাহত হয় না,অথবা তা পান না পর্যন্ত পায়খানাও হয় না। যাদের দৈনিক সিগারেট পানে সময় অপচয় হয় তাদের উচিৎ রোযার এই পবিত্র সময়ে এই ধরনের বিষপান চিরদিনের জন্য পরিত্যাগ করা। কারণ এই সুখটান মানুষের সুস্বাস্থ্য,দেহ,অর্থ,দ্বীন,দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য বড় ক্ষতিকর। কোনক্রমেই উচিৎ নয় যে,রোযাদার সারাদিন হালাল জিনিস না খেয়ে রোযা রেখে পরিশেষে হারাম জিনিস দিয়ে রোযা খুলবে।

রোযা মুসলিমের জন্য আল্লাহর এক প্রকার রহমত,করুণা ও অনুগ্রহ। মহান আল্লাহ মুসলিম জাতির প্রতি অনুগ্রহ ও করুণা প্রদর্শন করেই রোযা ফরয করেছেন। কারণ,এরই মাধ্যমে তিনি মুসলিমের পাপরাশি মার্জনা করে থাকেন,তার মর্যাদা উন্নীত করে থাকেন এবং বহুগুণ হারে তার সওয়াব বৃদ্ধি করে থাকেন। রোযাদার ব্যক্তির দুআ রোযা রাখা অবস্থায় কবুল হয়ে থাকে। প্রিয় নবী (সাঃ)বলেন,'তিন প্রকার দুআ আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে থাকে,রোযাদারের দুআ,অত্যাচারিতের দুআ এবং মুসাফিরের দুআ'।

রোযার উপবাস স্বাস্থ্যের জন্য বড় উপকারী। রোযাতে তুলনামূলকভাবে কম খাওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট সময় ধরে পাকস্থলীকে বিরতি দেওয়া হয়। এর ফলে শরীরের মেদ,ক্লেদ ও আর্দ্রতা ইত্যাদি দূরীভূত হয়ে যায়। আর একথা ঠিক যে,শরীরের মধ্যে পেট হল রোগের বাসা এবং ব্যবস্থাপিত ও নিয়ন্ত্রিত খাদ্য আহার করা হল শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা। এ কথা বহু চিকিৎসকই স্বীকার করেছেন যে,রোযাতে রয়েছে বহু দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি থেকে নিরাপত্তা বিশেষ করে যক্ষ্মা,ক্যানসার ইত্যাদি। রোযায় রয়েছে শরীরের ওজন বৃদ্ধি,হেপাটাইটিস, জন্ডিস,প্লীহা,যকৃৎ,বদহজম ও প্রভৃতি রোগের চিকিৎসা।

রোযা মানুষের চিন্তাশক্তির প্রখরতা বৃদ্ধি করে। কারণ,পেট খালি থাকলে চিন্তা-গবেষণা নির্মল হয় এবং মন-মগজের কর্ম সুন্দর হয়। পক্ষান্তরে যারা ধারণা করে যে,রোযা মানুষের খরচ বাড়ায় এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয় এই রোযার মাসে,তাদের ধারণা সঠিক নয়। কেননা খাবারের নানান ভ্যারাইটিজ তৈরী করা এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশী খাবার প্রস্তুত করা,রমাযানের জন্য বিশেষ ধরন ও বরনের খাদ্যপণ্যের বিপণন ঘটানোতে ইসলামের অনুমোদন নেই। বরং তা হল অপচয়। আর অপচয় ইসলামে নিষিদ্ধ, রমাযানে এবং অন্য মাসেও। চিরন্তন সত্য যে,রোযাতে রয়েছে মঙ্গল। ব্যক্তি ও সমাজের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে সেই মঙ্গল অনস্বীকার্য। আর মহান আল্লাহর এই বাণীর মধ্যে সেই মঙ্গলের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। তিনি বলেন,তোমাদের রোযা রাখাটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর,যদি তোমরা উপলব্ধি কর।(সূরা বাকারা-আয়াত/১৮৪)।

রোজাদারদের জন্য পুরুস্কার

রোযার প্রতিদান আল্লাহ রাববুল আলামীন নিজেই দিবেন এবং বিনা হিসাবে দিবেন। প্রত্যেক নেক আমলের নির্ধারিত সওয়াব ও প্রতিদান রয়েছে,যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমলকারীকে পুরস্কৃত করবেন। কিন্তু রোযার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ রোযার বিষয়ে আছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এক অনন্য ঘোষণা। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ)থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন,'মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকীর সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতাশ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,কিন্তু রোযা আলাদা। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে'।(মুসলিম-হাদীস/১১৫১(১৬৪),(মুসনাদে আহমদ-হাদীস/৯৭১৪),(মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-হাদীস/৮৯৮৭),(সুনানে ইবনে মাজাহ-হাদীস-১৬৩৮)।

অন্য বর্ণনায় আছে, হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন,রাসূলুল্লাহ (সাঃ)ইরশাদ করেছেন,আল্লাহ রাববুল আলামীন বলেন,বান্দা একমাত্র আমার জন্য তার পানাহার ও কামাচার বর্জন করে,রোযা আমার জন্যই, আমি নিজেই তার পুরস্কার দিব আর(অন্যান্য)নেক আমলের বিনিময় হচ্ছে তার দশগুণ'।(সহীহ বুখারী-হাদীস/১৮৯৪),(মুসনাদে আহমদ-হাদীস/৯৯৯৯),(মুয়াত্তা মালেক-১/৩১০)। রোযা বিষয়ে অন্য বর্ণনায় আছে আল্লাহ তাআলা বলেন,'প্রত্যেক ইবাদতই ইবাদতকারী ব্যক্তির জন্য,পক্ষান্তরে রোযা আমার জন্য। আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব'।(সহীহ বুখারী-হাদীস/১৯০৪)।

শেষ কথা

রমাযান মাসের ফজিলত ও সুন্নাতসমুহ,গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। যা সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। অতএব রমাযান মাস পাওয়ার মত সৌভাগ্যের বিষয় আর কী হতে পারে। আমরা যদি এ মাসের প্রতিটি আমল সুন্নাহ পদ্ধতিতে করতে পারি তবেই আমাদের রমাযান পাওয়া সার্থক হবে।

কেননা হাদীসে এসেছে,'যে ব্যক্তি রমাযান মাস পেলো অথচ তার গুনাহ মাফ করাতে পারল না সে ধ্বংস হোক'। (শারহুস সুন্নাহ-৬৮৯) আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রমাযান মাসের ফজিলত হাসিল করার তাওফীক দান করুন। আরো জানতে ভিজিট করুন.. 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

AymansGlobal এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url